চাষার দুক্ষু-
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :
সভ্যতার বস্তুগত দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।
মুষ্টিমেয় ধনী ব্যক্তির উন্নতিই যে দেশ ও জাতির উন্নতি নয়, সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।
জাতির মেরুদণ্ড চাষার সাথে অন্যান্য পেশাজীবী শ্রেণির আয় বৈষম্য সম্পর্কে জানতে পারবে।
বর্তমানে বাংলার কৃষকদের অবর্ণনীয় শ্রম এবং তাদের নিদারুণ দারিদ্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।
পূর্বে দেশবাসীর বস্ত্র সমস্যা সমাধানে কৃষকরমণীদের অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে।
সভ্যতার নামে পরানুকরণ ও বিলাসিতায় দরিদ্র কৃষকের ক্ষতিকর পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবে।
আমাদের পরিত্যাগ করা স্বদেশী পণ্য লুফে নিয়ে ইউরোপীয়দের প্রচুর মুনাফা অর্জন সম্পর্কে জানতে পারবে।
সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দেশি শিল্পগুলো ক্রমশ বিলুপ্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে পারবে।
দেশের চাষিদের অবস্থার পরিবর্তনে স্বদেশী পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারবে।
পাঠশালা আর ঘরে ঘরে চরকা ও টেকোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে।
উৎস পরিচিতি :
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত ‘চাষার দুক্ষু’ শীর্ষক রচনাটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত “রোকেয়া রচনাবলি থেকে নেওয়া হয়েছে।
মূলবাণী/মর্মবাণী/উপজীব্য বিষয়: কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি
শব্দার্থ ও টীকা
ছেইলা – ছেলে। সন্তান-সন্ততি অর্থে।
পৈছা – স্ত্রীলোকদের মণিবন্ধনের প্রাচীন অলঙ্কার।
দানা – খাদ্য অর্থে।
অভ্রভেদী – অভ্র অর্থ আকাশ।
ট্রামওয়ে – ট্রাম চলাচলের রাস্তা।
বায়স্কোপ – চলচ্চিত্র, ছায়াছবি, সিনেমা।
চাষাই সমাজের মেরুদন্ড – বাংলা কৃষিপ্রধান দেশ।
কৌপিন – ল্যাঙ্গট।
মহীতে – পৃথিবীতে।
টেকো – সুতা পাকাবার যন্ত্র।
এন্ডি – মোটা রেশমি কাপড়।
বেলোয়ারের চুড়ি – উৎকৃষ্ট স্বচ্ছ কাচে প্রস্তুত চুড়ি।
সারমর্ম
তাঁর শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাÐ থেকে শুরু করে লেখালেখির জগৎ উৎসর্গ করা হয়েছে পশ্চাৎপদ নারীসমাজের মুক্তি ও সমৃদ্ধির জন্য। কিন্তু ‘চাষার দুক্ষু’ শীর্ষক প্রবন্ধটি তৎকালীন দারিদ্র্যপীড়িত কৃষকদের বঞ্চনার মর্মন্তুদ দলিল হয়ে আছে। ভারতবর্ষের সভ্যতা ও অগ্রগতির ফিরিস্তি তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, সেখানে কৃষকদের অবস্থা কত শোচনীয়। কুটির শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়ে আত্মনির্ভরশীল গ্রাম সমাজকে চরম সংকটের মধ্যে ফেলেছে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী। কৃষকদের এই মুমূর্ষু অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন গ্রামে গ্রামে পাঠশালা প্রতিষ্ঠানের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আর গ্রামীণ কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন। এই প্রবন্ধে রোকেয়ার অসাধারণ পাÐিত্য, যুক্তিশীলতা ও চিন্তার বিস্ময়কর অগ্রসরতার প্রতিফলন ঘটেছে।
গুরুত্বপূর্ণ লাইন
চাষাই সমাজের মেরুদণ্ড।
দেড় শত বৎসর পূর্বে ভারতবাসী অসভ্য বর্বর ছিল।
তবে আমার ‘ধান ভানিতে শিবের গান’ কেন?
একটি চাউল পরীক্ষা করিলেই হাঁড়ি ভরা ভাতের অবস্থা জানা যায়।
“ধান্য তার বসুন্ধরা যার”।
“কৃষক কন্যা জমিরনের মাথায় বেশ ঘন ও লম্বা চুল ছিল, তার মাথায় তেল লাগিত প্রায় আধ পোয়াটাক।
এই তো ৩০/৩৫ বৎসর পূর্বে বিহার অঞ্চলে দুই সের খেসারির বিনিময়ে কৃষক পত্মী কন্যা বিক্রয় করিত।
সুতরাং দেখা যায়, ইউরোপীয় মহাযুদ্ধের সহিত চাষার দারিদ্র্যের সম্পর্ক অতি অল্পই।
কৃষক রমণী স্বহস্তে চরকায় সুতা কাটিয়া বাড়িসুদ্ধ সকলের জন্য কাপড় প্রস্তুত করিতে।
আসাম এবং রংপুর জেলায় এক প্রকার রেশম হয়, স্থানীয় ভাষায় তাহাকে ‘এন্ডি’ বলে।
এন্ডি কাপড় বেশ গরম এবং দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়।
একখানি এন্ডি কাপড় অবাধে ৪০ (চল্লিশ) বৎসর টেকে।
পল্লিগ্রামে সুশিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা হওয়া চাই।
গ্রামে গ্রামে পাঠশালা আর ঘরে ঘরে চরকা ও টেকো হইলে চাষার দারিদ্র্য ঘুচিবে।
গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর(জ্ঞানমূলক)
১. ভারতবাসী অসভ্য বর্বর ছিল – ১৫০ বছর আগে।
২. দেড়শত বৎসর হইতে আমরা হইতেছি – সভ্য থেকে সভ্যতর।
৩. আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ও জাতির সমকক্ষ হইতে চলিয়াছি- শিক্ষায়, সম্পদে।
৪. এখন আমাদের স্থান নাই – সভ্যতা ও ঐশ্বর্য রাখিবার।
৫. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে লেখিকা ইউরোপের মহাযুদ্ধকে উল্লেখ করেছেন – ৭ বছর আগের ঘটনা বলে।
৬. লেখিকার মতে চাষার অবস্থা খুব ভালো ছিল না ঐ সময় হতে – ৫০ বছর আগেও।
৭. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে লেখিকার সময় হতে ৫০ বছর আগে টাকায় সরিষার তৈল পাওয়া যেত – ৮ সের।
৮. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে লেখিকার সময় হতে ৫০ বছর আগে টাকায় ঘৃত পাওয়া যেত – ৪ সের।
৯. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে লেখিকা তখনকার সময়ের একটি গল্পের উল্লেখ করেছেন যখন- টাকায় ৮ সের সরিষার তৈল পাওয়া যেত।
১০. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে উলেখিত গল্পে কৃষককন্যার নাম – জমিরন।
১১. মাথায় বেশ ঘন ও লম্বা চুল ছিল – জমিরনের।
১২. জমিরনের মাথায় তেল লাগিত প্রায় – আধ পোয়াটাক।
১৩. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে লেখিকা অত্যন্ত দরিদ্র বলেছেন – রংপুর জেলার কোন কোন গ্রামের কৃষকদের।
১৪. ধান ও পাটের জন্য প্রসিদ্ধ – রংপুর।
১৫. ইউরোপীয় মহাযুদ্ধের সাথে চাষার দারিদ্র্যের সম্পর্ক – অতি অল্প।
১৬. এখন টাকায় ৩/৪ সের চাউল পাওয়া সত্তে¡ও কৃষক থাকে- অর্ধানশনে।
১৭. ‘মরাই ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু’- কৃষকের এরূপ অবস্থা ছিল লেখিকার সময় হতে অন্তত – শতাধিক বছর আগে।
১৮. লেখিকার সময় হতে অন্তত শতাধিক বছর আগে কৃষক রমণী কাপড় প্রস্তুত করিত – স্বহস্তে চরকায় সুতা কাটিয়া।
১৯. আসাম এবং রংপুর জেলায় যে রেশম হয় তার নাম – এন্ডি।
২০. এন্ডি রেশমের পোকা প্রতিপালন ও তাহার গুটি হইতে সুতা কাটা – অতি সহজসাধ্য কার্য।
২১. তৎকালীন কেউ কারও বাড়ি দেখা করিতে যাইবার সময় হাতে লইয়া যাইত – টেকো (সুতা পাকাবার যন্ত্র)।
২২. লেপ, কম্বল, কাঁথা কিছুই প্রয়োজন হয় না- ৪/৫ খানি এন্ডি কাপড় থাকিলে।
২৩. সেকালে রমনীগণ হাসিয়া খেলিয়া পূরণ করিত – বস্ত্র সমস্যা।
২৪. লেখিকার সময় হতে অন্তত শতাধিক বছর আগে চাষা অন্নবস্ত্রের কাঙাল ছিল না কারণ – সে তখন অসভ্য বর্বর ছিল।
২৫. এখন চাষাদের পেটে ভাত নাই কারণ – সে সভ্য হইয়াছে।
২৬. পূর্বে পল্লীবাসিনীগণের কাপড় কাচার জন্য প্রয়োজন হইত – ক্ষার।
২৭. এখন পল্লিবাসিনীগণের কাপড় কাচার জন্য প্রয়োজন হয় – ধোপার।
২৮. পল্লীবাসিনীগণের শিরায় শিরায়, ধমনীতে ধমনীতে প্রবেশ করিয়াছে-বিলাসিতা।
২৯. মুটে মজুর দুই পদ নড়িতে পারে না- ট্রাম না হইলে।
৩০. প্রথম দৃষ্টিতে ট্রামের ভাড়া পাঁচটা পয়সা মনে হয় – অতি সামান্য।
৩১. ট্রামে যাইতে আসিতে লাগিয়া যায় – দশ পয়সা।
৩২. বিলাসিতা ওরফে সভ্যতার সাথে তাহাদের স্কন্ধে চাপিয়া আছে- অনুকরণপ্রিয় নামক আর একটা ভূত।
৩৩. তাহাদের আর্থিক অবস্থা সামান্য একটু সচ্ছল হইলেই তাহারা অনুকরণ করিয়া থাকে – প্রতিবেশী বড়লোকদের।
৩৪. ‘চাষার বৌ ঝির যাতায়াতের জন্য সওয়ারি চাই; ধান ভানিবার জন্য ভারানি চাই’- এগুলোর উল্লেখ করে লেখিকা বোঝাতে চেয়েছেন তাহাদের- অনুকরণপ্রিয়তা নামক দোষটিকে।
৩৫. সভ্যতার চূড়ান্ত হইবে – শিবিকাবাহকগণ পালকি লইয়া ট্রামে যাতায়াত করিলেই।
৩৬. আমরা সুসভ্য হইয়া পরিত্যাগ করিয়াছি – এন্ডি কাপড়।
৩৭. ইউরোপীয় নর-নারীদের অঙ্গে কোট, প্যান্ট ও স্কার্ট রূপে এন্ডি কাপড় শোভা পাইল – আসাম সিল্ক নামে।
৩৮. ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে প্রতিফলন ঘটেছে – বেগম রোকেয়ার অসাধারণ পাÐিত্য, যুক্তিশীলতা ও চিন্তার বিস্ময়কর অগ্রসরতার।
প্রথম ও শেষ লাইন
প্রথম লাইন: ক্ষেতে ক্ষেতে পুইড়া মরি, রে ভাই পাছায় জোটে না ত্যানা।
শেষ লাইন: গ্রামে গ্রামে পাঠশালা আর ঘরে ঘরে চরকা ও টেকো হইলে চাষার দারিদ্র ঘুচিবে।