বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
শব্দার্থ ও টীকা
- বিভীষণ – রাবণের কনিষ্ঠ সহোদর।
- অরিন্দম – অরি বা শত্র“কে দমন করে যে।
- পশিল – প্রবশে করল।
- রক্ষঃপুরে – রাক্ষসদের পুরী বা নগরে।
- তাত – পিতা।
- নিকষা – রাবণের মা।
- কুম্ভকর্ণ – রাবণের মধ্যম সহোদর।
- বাসববিজয়ী – দেবতাদের রাজা ইন্দ্র বা বাসবকে জয় করেছে যে,
- তস্কর – চোর।
- গঞ্জি – তিরস্কার কবি।
- ভঞ্জিব আহবে – যুদ্ধদ্বারা বিনষ্ট করব।
- আহবে – যুদ্ধে।
- ধীমান্ – ধীসম্পন্ন।
- রাঘব – রঘুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান।
- রাঘবদাস – রামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ।
- রাবণি – রাবণের পুত্র।
- স্থাপিলা বিধুরে বিধি
- স্থাণুর ললাটে – বিধাতা চাঁদকে আকাশে নিশ্চল করে স্থাপন করেছেন।
- বিধু – চাঁদ।
- রক্ষোরথি – রক্ষকুলের বীর।
- রথী – রথচালক।
- শৈবালদের ধাম – পুকুর।
- শৈবাল – শ্যাওলা।
- মৃগেন্দ্র – পশুরাজ সিংহ।
- কেশরী – কেশযুক্ত পশুরাজ সিংহ।
- মহারথি – মহাবীর।
- মহারথীপ্রথা – শ্রেষ্ঠ বীরদের আচরণ প্রথা ।
- সৌমিত্রি – লক্ষ¥ণ।
- নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার – লঙ্কাপুরীতে মেঘনাদের যজ্ঞস্থান।
- প্রগল্ভে – নির্ভীক চিত্তে।
- নন্দন কানন – স্বর্গের উদ্যান।
- মহামন্ত্র-বলে যথা
- নম্রশিরঃ ফণী – মন্ত্রপূত সাপ যেমন মাথা নত করে।
- লক্ষি – লক্ষ করে।
- ভর্ৎস – তিরস্কার করছ।
- মজাইলা – বিপদগ্রস্ত করলে।
- বসুধা – পৃথিবী।
- রুষিলা – রাগান্বিত হলো।
- মন্দ্র – শব্দ, ধ্বনি।
- জীমূতেন্দ্র – মেঘের ডাক বা আওয়াজ।
- জলাঞ্জলি – সস্পূর্ণ পরিত্যাগ।
- দুর্মতি – অসৎ বা মন্দ বুদ্ধি।
কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ
- এতক্ষণে অরিন্দম / কহিলা বিষাদে (৮ + ৬)
- জানিনু কেমন আসি / ল²ণ পশিল ( ৮ + ৬)
- রক্ষপুরে! হায়, তাত / উচিত কি তব (৮ + ৬)
- এ কাজ? নিকষা সতী / তোমার জননী! (৮ + ৬)
বিশ্লেষণ : “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি ছন্দ বিশ্লেষণে দেখা যায় এটি ১৪ মাত্রার প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। পংক্তির রচনান্তে মিল না থাকায় এর পর্ব অমিত্রাক্ষর ছন্দের অভিধান পেয়েছে। এ প্রতিটি পংক্তি বা চরণ ৮ ও ৬ মাত্রায় দুটি পর্বে বিভক্ত হয়ে মোট ১৪টি মাত্রায় রচিত হয়েছে। এখানে যে শুধু অন্ত্যমিল রক্ষিত হয়নি তাই নয়, বিরামচিহ্ন ব্যবহারেও স্বাধীন হয়েছেন কবি। তিনি বিরামচিহ্ন ব্যবহারে বক্তব্যের অর্ধেকে বা স্পষ্টতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যার ফলে ভাব প্রকাশের প্রবহমানতা কবিতাংশে ছন্দের বিশেষ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়।
ছন্দ : “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি ১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। প্রথম পংক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় পংক্তির চরণান্তের মিলনহীনতার কারণে এ ছন্দ ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ নামে সমধিক পরিচিত। এ কাব্যাংশের প্রতিটি ১৪ মাত্রায় এবং (৮ + ৬) মাত্রার দুটি পর্বে বিন্যস্ত। লক্ষ করার বিষয় যে, এখানে দুই পংক্তির চরণান্তিক মিলই কেবল পরিহার করা হয়নি, যতিপাত বা বিরামচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহারও হয়েছে বিষয় বা বক্তব্যের অর্থের অনুষঙ্গে। এ কারণে ভাবপ্রকাশের প্রবহমানতাও কাব্যাংশটি ছন্দের বিশেষ লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য।
পয়ার ছন্দ; ও অমৃত্রাক্ষর ছন্দ!
মধুসূদন – পূর্ব হাজার বছরের বাংলা কবিতার ছন্দ ছিল পয়ার। একটি চরণের শেষে আর একটি চরণের মিল ছিল ঐ ছন্দের অনড় প্রথা। মধুসূদন বাংলা কবিতার এ প্রথাকে ভেঙ্গে দিলেন। তিনি প্রথম চরণের সঙ্গে দ্বিতীয় চরণের মিল রক্ষা করেননি বলেই তাঁর প্রবর্তিত ছন্দকে বলা হয় ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’। তবে এটি বাংলা অক্ষরবৃত্ত ছন্দেরই নবরূপায়ণ। তাঁর শ্রেষ্ঠতম কীর্তি মেঘনাদ বধ কাব্যে’ এ ছন্দের সফল প্রয়োগ ঘটে। এ ছন্দে আরও কিছু নতুন বিষয় তিনি যোগ করেছিলেন বলে একে বলা হয় “১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দ”।
কবিতার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিশ্লেষণ
রাবন: দ্বীপরাজ্য স্বর্ণলঙ্কার রাজা, যিনি পুরাণের রাক্ষসরাজ (বাল্মীকি-রামায়ণে খলনায়ক কিন্তু মধুসূদন-মেঘনাদবধ মাহাকাব্যে নায়ক), মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত, রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, কনক লঙ্কা-মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত, রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, কনক লঙ্কা-রাজ্য।
কুম্ভকর্ণ: রাজা রাবণের মধ্যম ভাই, শূলিশম্ভুনিভ
বিভীষণ: রাজা রাবনের ছোই ভাই, তাত, পিতৃতুল্য, গুরু জন, রথী রাবণ-অনুজ, রামের ভক্ত, রাম-রাবণের যুদ্ধে স্বপক্ষ ত্যাগকারী, রাঘবদাস, মেঘনাদের চাচা, পিতৃব্য, রক্ষোরথি, প্রভু, বীরকেশরী, বিজ্ঞতম তুমি, মহারথী, আমি, রাক্ষসরাজানুজ, রক্ষোবর, দূর্মতি।
নিকষা: রাবণের মা, সতী।
বীরবাহু: রাজা রাবণের পুত্র, যুদ্ধে মুত্যু হয়।
মেঘনাদ: রাজা রাবণের কনিষ্ঠ পুত্র, অরিন্দম, বাসববিজয়ী, ধীমান, রাবণি, দাসেরে, অজ্ঞ দাস, ভ্রাতৃ-পুত্র, বৎস, রাবণ-আত্মজ, বাসবত্রাস, দাসে।
রাম: রাজা রামচন্দ্র, রঘুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান (বাল্মীকি-রামায়ণের নায়ক, মধুসূদন-মেঘনাবধ, মহাকাবব্যে খলনায়ক ও হীনরূপে উপস্থাপিত), রাঘব, অধম রাম।
লক্ষণ: রামের কনিষ্ঠ ভাই, তস্কর, রামানুজ, শৃগাল, ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, সৌমিত্রি কুমতি, দৈত্য, দুরাচার দৈত্য, নরাধম, বনবাসী, দম্ভী, চণ্ডাল।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার: রক্ষঃপুর, লঙ্কাপুরীতে মেঘনাদের যজ্ঞাস্থান।
জেনে রাখা দরকার
- ১. অরিন্দম-মেঘনাদের উপাধি।
- ২. রক্ষ:পুর বলতে বুঝানো হয়েছে-লঙ্কাপুরকে।
- ৩. মেঘনাদের রাজ্যের নাম-লঙ্কাপুর।
- ৪. মেঘনাদের বাবার নাম-রাবণ।
- ৫. মেঘনাদের চাচার নাম-বিভীষণ।
- ৬. রাবনের মায়ের নাম-নিকষা।
- ৭. রামানুজ হলো ল²ণ-(রামের ছোট ভাই)
- ৮. লক্ষণের মায়ের নাম সুমিত্রা।
- ৯. সৌমিত্রি বলতে বুঝানো হয়েছে-ল²ণকে।
- ১০. রাঘবদাস হল-বিভীষণ।
- ১১. প্রফুল কমলে বাস করে-কীট।
- ১২. রাবণ-অনুজ হল-বিভীষণ।
- ১৩. রাবণ আত্মজ হল-মেঘনাদ।
- ১৪. সর্বদা পাপ থেকে বিরত থাকে-দেবতারা।
- ১৫. বীরেন্দ্র বলী’ বলা হয়েছে- মেঘনাদকে।
- ১৬. রাক্ষসরাজ হল-রাবণ।
- ১৭. রাক্ষরাজানুজ হল-বিভীষণ।
- ১৮. জগতে বিখ্যাত-বিভীষণ
সারমর্ম
মেঘনাবদ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গে লক্ষণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে মৃত্যু ঘটে অসমসাহসী বীর মেঘনাদের। রামচন্দ্র কর্তৃক দ্বীপরাজ্যে স্বর্ণালঙ্কা আক্রান্ত হলে রাজা রাবন শত্র“র উপুর্যপরি দৈব কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পর মেঘনাদকে পিতা রাবন পরবর্তী দিবসে অনুষ্ঠেয় মহাযুদ্ধের সেনাপতি হিসাবে বরণ করে নেন।
যুদ্ধজয় নিশ্চিত করার জন্য মেঘনাদ যুদ্ধযাত্রার পূর্বেই নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইস্টদেবতা অগ্নিদেবের পূজা সম্পন্ন করতে মনস্থির করে। মায়া দেবীর আনুকুল্যে এবং রাবণের অনুজ বিভীষণের সহায়তায় লক্ষণ শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশে সমর্থ হয়। কপট লক্ষণ নিরন্ত্র মেঘনাদের কাছে যুদ্ধ প্রার্থনা করলে মেঘনাদ বিস্ময় প্রকাশ করে। শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষণের অনুপ্রবেশ যে মায়াবলে সম্পন্ন হয়েছে বুঝতে বিলম্ব ঘটেনা তার। ইতিমধ্যে লক্ষণ তলোয়ার কোষমুক্ত করলে মেঘনাদ যুদ্ধসাজ গ্রহণের জন্য সময় প্রার্থনা করে লক্ষণের কাছে। কিন্তু লক্ষণ তাকে সময় না দিয়ে আক্রমণ করে। এ সময়ই অকসস্মাৎ যজ্ঞাগারের প্রবেশদ্বারের দিকে চোখ পড়ে মেঘনাদেব দেখতে পায় বীরযোদ্ধা পিতৃব্য বিভীষণকে। মুহুর্তে স্পষ্ট হয়ে যায় তার কাছে। খুলুতাত বিভীষণকে প্রত্যক্ষ করে দেশপ্রেমিক নিরস্ত্র মেঘনাদ যে পতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, সেই নাটকীয় ভাষাই বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ অংশে সংকলিত হয়েছে। এ অংশে মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ও দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়েছে ঘৃণা। জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও জাতিসত্তার সংহতির গুরুত্বের কথা যেমন এখানে ব্যক্ত হয়েছে তেমনি এর বিরুদ্ধে পরিচালিত যড়যন্ত্রকে অভিহিত করা হয়েছে নীচতা ও বর্বরতা বলে।
পাঠ বিশ্লেষণ
- “এতক্ষণে”- অরিন্দম কহিলা বিষাদে,
- “জানিনু কেমনে আসি ল²ণ পশিল
- রক্ষপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
- এ কাজ? নিকষা সতী তোমার জননী!
- সহোদর রক্ষ:শ্রেষ্ঠ! শুলিশম্ভুনিভ
- কুম্ভবর্ণ! ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী!
- নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
- চণ্ডালে বসাও আনি বাজার আলয়ে?
সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে রূদ্ধদ্বারা নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করল ল²ণ। তার এই অনুপ্রবেশের অন্যতম সহায়ক রাবণের কনিষ্ঠ সহোদর বিভীষণ। সে-ই হয়তো ল²ণকে পথ দেখিয়েছে। এই ভেবে মেঘনাদ বিস্মিত ও মর্মাহত হলেন। বিভীষণের এহেন কাজ করা কি উচিত হয়েছে? সত্যি নিকষা যার মা, তার পক্ষে এরকম একটি হীন করা কী করে সম্ভব? তাছাড়া সেখানে রয়েছে রাবণের মধ্যম সহোদর কুম্ভবর্ণ, যে কিনা শুলপাণি মহাদেবের মতো ; আর যেখানে তার ভাইয়ের পুত্র দেবতাদের রাজা ইন্দ্রকে জয় করেছে, সেখানে বিভীষণ এমনটি কী করে করল? মেঘনাদের মনে প্রশ্ন জাগল- এত কিছুর পরও শত্র“কে পথ চিনিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে এলো? চোরকে প্রশ্রয় দিল? চÐালের মতো নিম্নশ্রেণির কাউকে এনে রাজকক্ষে স্থান দিল?
- কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরুজন তুমি
- পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
- পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে
- লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঙ্গিব আহবে।
কিন্তু তা হোক, তবু তাকে সে অবহেলা করে না। কারণ গুরুজনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ তার। কারণ সে পিতৃতুল্য। সে অস্ত্রাগারে গিয়ে যুদ্ধের সাজ গ্রহণ করে আসবে বলে তাকে দ্বারা থেকে সরে দাঁড়াতে অনুরোধ করল। কারণ সে রামের অনুজ ল²ণকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে চায়। তাঁর সাথে যুদ্ধ করে, তাঁকে পরাজিত করে লঙ্কার সমস্ত কলঙ্ক কালিমা মুছে দিতে চায়।
- উত্তরিলা বিভীষণ, “বৃথা এ সাধনা,
- ধীমান। রাঘবদাস আমি ; কী প্রকারে
- তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতেৎ
- অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি;-
- “হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
মেঘনাদের এসব কথা এবং অনুরোধ শুনে বিভীষণ জবাব দিল- ‘না তা হয় না। তোমার এ চেষ্টা বৃথা, তোমার এ সাধনা ব্যর্থতা ছাড়া কিছু নয়।’ কারণ তোমার অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে আমি কি তার বিরুদ্ধে কাজ করব? তখন রাবণের পুত্র রাবণি(মেঘনাদ) কাতর সুরে বলল, হে শ্রদ্ধেয় পিতৃব্য তোমার এক কথা শোনার চেয়ে আমার মরণ ভালো ছিল, তোমার কথায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
- রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
- আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!
- স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে ;
- পড়ি কি ভুতলে শশী যান গড়াগড়ি
- ধুলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে
- কে তুমি? জনম তব কোন মহাকুলে?
তুমি রাঘবের দাস? এ কথা তুমি মুখে আনলে কী করে? পিতৃব্য বলো সে কথা তোমার এ দাসেরে। বিধাতা চাঁদকে আকাশে যে নিশ্চল করে স্থাপন করেছেন তাই বলে চাঁদ কি ধুলায় গড়াগড়ি যায়? তাহলে তুমি কী করে এমন হলে, তুমি রক্ষকুলের বীর হয়ে কী করে নিজের পরিচয়কে ভুলে গেলে। তুমি কি ভাবতে পার না কোন মহাকুলে তোমার জন্ম ; তোমার উচ্চবংশ পরিচয়?
- কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
- করে কেলি রাজহংস পঙ্কজ- কাননে
- যায় কি সে কভু, প্রভু, পঙ্কিল সলিলে,
- শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র কেশরী,
- কবে, হে বীরকেশরি, সম্ভাষে শৃগালে
- মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
- অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
আর কে সে অধম রাম, তা কি তুমি জান না? রাজহাঁস কী কখনো কাদা, ময়লা, ঘোলা জলে যায়, সাঁতার কাটে? সে তো স্বচ্ছজলে সরোবের জলকেলি করে বেড়ায়। সে তো বদ্ধ জলাশয়ে শেওলার মধ্যে ঘোরাঘুরি করে না। পশুরাজ সিংহকে কী কখনও দেখেছ শিয়ালের সাথে সখ্য গড়ে তুলতে কিংবা সম্মানে তার কাছে মাথা নত করতে? সিংহরাজের কেশর তার আভিজাত্যের সম্মানের রাজার চিহ্ন বহন করে, শিয়ালের তা নেই, সে সিংহের দাস। আমি জ্ঞানহীন মূর্খ, তোমার আজ্ঞাবহ, কিন্তু তুমি তো সর্বজ্ঞানে মহাজ্ঞানী, গুণী। তোমার তো কিছু অজানা নয়।
- ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, ল²ণ; নহিলে
- অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
- কহ,মহারথী, এ কি মহারথী প্রথা?
- নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
- এ কথা ! ছাড়হ পথ ; আসিব ফিরিয়া
- এখনি! দেখবি আজি, কোন দেববলে,
- বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!
- দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
- রক্ষ:শ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের! কী দেখি
- ডরিবে এ দাস হেন দুর্বল মানবে?
লক্ষণ তো ছোট মনের হীন মানসিকতাসম্পন্ন এক নরাধম। তা না হলে অস্ত্রহীন, যুদ্ধের বেশহীন অপ্রস্তুত আমাকে তার সাথে যুদ্ধ করতে বলে? হে মহাবীর, তুমিই বলো- নিরস্ত্রের সাথে যুদ্ধ করা কি কোন বীরের আচরণ-প্রথা। একজন শিশুও খুঁজে পাবে না এ লঙ্কাপুরে যারা এহেন কথা শুনে হাসবে না। কাজেই আমার কথা শোন, পথ ছেড়ে দাও, আমাকে যেতে দাও, আমি এখনই ফিরে আসব। তখন সুমিত্রার সন্তান ল²ণকে তার কুমোহ মিটিয়ে দেব। রক্ষকুলের হে বীর, দেব-দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধ তো তুমি স্বচক্ষে দেখেছ। সেখানকার পরাক্রমও তুমি জানো। তাহলে দুর্বল মানবকে দেখে ভয়ে কি পালাবে তোমার এ আজ্ঞাবহ?
- নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগল্ভে পশিল
- দম্ভী ; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
- তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
- বনবাসী! হে বিধাতঃ নন্দন-কাননে
- ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল কমলে
- কীটবাস? কহ তাত, সহিব কেমনে?
- হেন অপমান আমি, – ভ্রাতৃ-পুত্র তব?
লঙ্কাপুরীর তীর্থস্থান এই নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে নির্ভীকচিত্তে, যে অহংকার সে করছে, তুমি এই আজ্ঞাবহ দাসকে অনুমতি কর, সেই নরাধমকে উপযুক্ত শান্তি দান করতে। তোমার এই অন্ত:পুরে জন্ম নিয়ে আজ এমনি নির্বাসন দণ্ড, বনবাস। হে প্রভু, এই শ্রীমণ্ডিত অতি মনোরম করে সাজানো বাগানে ভুল করে কেন এই দুরাচার দানবকে নিয়ে এলে। এ কি অপূর্ব সুন্দর বিকশিত ফুলের মধ্যে কীটের মতো নয়? বলো, কী করে আমি তো মেনে নেব? তোমারই ভাইয়ের পুত্র হয়ে কী করে সহ্য করব আমি এই অপমান?
- তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”
- মহামন্ত্র- বলে যথা নম্রশির: ফণী,
- মলিনবদন সাজে, উত্তরিলা রথী
- রাবণ- অনুজ, লক্ষি বারণ-আত্মজে ;
- “নহি দোষী আমি, বৎস; বৃথা র্ভৎস মোরে
- তুমি! নিজ কর্ম-দোষে, হায়, মজাইলা
- এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি!
আর রক্ষোকুলের বীর হয়ে তুমিও কীভাবে তা সহ্য করছ? মহামন্ত্র-বলে ফণা তোলা সাপ যেমন মাথা নত করে, তুমিও তাহলে তেমনি করে মাথানত করেছ? এসব কথা শুনে রক্ষ:কুল বীর রথী বিভীষণ তখন মলিন মুখে লজ্জাবনত হয়ে মেঘনাদকে বলল- এসবের জন্য আমি দায়ী নই। আমাকে অযথাই দোষারোপ করছ ; বৃথাই তিরস্কার করছ বাছা। তোমার নিজের কর্ম-দোষেই তুমি আজ এমন বিপদগ্রস্ত। এ অবস্থার জন্য তুমি নিজেই বেশি দায়ী।
- বিরত সতত পাপে দেবকূল; এবে
- পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী; প্রলয়ে যেমতি
- বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে!
- রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
- তেঁই আমি। পরদোষে কে চাহে মজিতে?”
মনে রেখো, দেবতারা সব সময় পাপমুক্ত। লঙ্কাপুরী এখন পাপে পূর্ণ। ঝড়ঝঞ্জায় পৃথিবীর মতো ডুবতে বসেছে লঙ্কাপুরী, ভয়াল স্রোতে সব তছনছ হয়ে যাচ্ছে, ধ্বংসের মুখে আজ লঙ্কা নগরী। রঘুবংশীয় রামচন্দ্রের পদতলে যেহেতু আমি আশ্রয় লাভ করেছি; সেহেতু আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি না। আর অন্যের দোষ মাথায় নিয়ে কে বিপদগ্রস্ত হতে চায় বলো?
- রুষিলা বাসবত্রাস! গম্ভীরে যেমতি
- নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
- কহিলা বীরেন্দ্র বলী, – “ধর্ম পথগামী,
- হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
- তুমি ; – কোন্ ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,
- জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্বম জাতি- এ সকলে দিলা জলাঞ্জলি?
বাসবের ভয়ের কারণে মেঘনাদ তা শুনে সে ক্ষুব্ধ হলো। সেই ক্ষোভ গভীর রাতে স্তব্ধ পরিবেশ ভেঙ্গে আকাশে মেঘের গর্জনের মতো। বীর তখন আক্রোশে ধর্মপথানুসারী রাক্ষসরাজের অনুজকে বললেন তুমি জগতে বিখ্যাত, কোন ধর্মানুসারে তুমি এমন কথা বলছ, এই আজ্ঞাবহ দাসকে একবার শোনাও। আত্মীয়ের পরিচয়, সহোদরের বন্ধন, জাত-ধর্ম এ সবকিছুই কি জলাঞ্জলি দিলে?
- শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
- পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
- নির্গুণ স্বজন শ্রেয় : পর: পর: সদা!
- এ শিক্ষা, হে রেক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?
- কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা! হেন সহবাসে,
- হে পিতৃব্য, বর্বরতা কেন না শিখিবে?
- গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি। ”
শাস্ত্রের কথাই সত্যি, গুণবান হলেও পর কখনও আপন হয় না। গুণহীন, মূর্খ হলেও আপনজন আপনজন-ই থাকে। তাইতো গুণবান পরজন থেকে স্বজন উত্তম। কেননা গুণবান হলেও পর সর্বদা পরই থেকে যায়। এমন শিক্ষা তুমি কোথা থেকে লাভ করলে হে রক্ষকুলের বীর? অথচ দেখ, আমি অযথাই তোমাকে তিরস্কার করছি তাদের সাথে থাকার জন্য। হে মান্যবর বীর, পিতৃব্য, তাই যদি হয়, তবে কেন শিখবে না বর্বরতা। চিন্তা যার অসৎ, হীন যার মানসিকতা, সে তো নিকৃষ্ট পথেই ধাবিত হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক, আর সেটাই তো সত্যি।
রূপক অর্থ
ঊনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাল্মীকি-রামায়নকে নবমূল্য দান করেছেন এ কাব্যে। মানবকেন্দ্রিকতাই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সারকথা। ঐ নবজাগরণের প্রেরণাতেই রামায়ণের রাম-ল²ণ মধুসূদনের লেখনীতে হীনরূপে এবং রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার মেঘনাদ যাবতীয় মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত। দেবতাদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত রাম-ল²ণ নয়, পুরাণের রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদের প্রতিই মধুসূদনের মমতা ও শ্রদ্ধা।
গুরুত্বপূর্ণ লাইন
- “এতক্ষণে”-অরিন্দম কহিলা বিষাদে।
- নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
- পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
- “হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে।
- আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
- প্রলয়ে যেমতি বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে!
- গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি।
গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (জ্ঞানমূলক)
- ১.‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কবিতাটি নেয়া হয়েছে – মেঘনাবধ কাব্যের ৬ষ্ঠ সর্গ ‘বধো’ (বধ) থেকে।
- ২. মেঘনাদবধ কাব্যের মোট সর্গসংখ্যা – ৯টি।
- ৩. ভ্রাতা ক্ম্ভুকর্ণ ও জ্যেষ্ঠ পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পর রাবণ তার যুদ্ধের সেনাপতি করেন – কনিষ্ঠ পুত্র মেঘনাদকে।
- ৪. যুদ্ধজয় নিশ্চিত করার জন্য মেঘনাদ মনস্থির করল – নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে
- ৫. শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ল²ণ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় – মায়াদেবীর আনুকূল্যে।
- ৬. শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ল²ণ নিকুম্ভিরা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় – রাবণের অনুজ বিভীষণের সহায়তায়।
- ৭. নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ল²ণ মেঘনাদের কাছে প্রার্থনা করে- যুদ্ধের।
- ৮. নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে মেঘনাদ ল²ণের কাছে প্রার্থনা করে- যুদ্ধসাজ গ্রহণ করতে সময় দেয়ার জন্য।
- ৯. নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারের প্রবেশদ্বারে মেঘনাদ দেখতে পায়- বিভীষণকে
- ১০. এ কবিতায় মাতৃভাষা প্রতি প্রকাশিত হয়েছে – ভালোবাসা।
- ১১. এ কবিতায় বিশ্বাসঘাতকতা ও দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়েছে – ঘৃণা।
- ১২. এ কবিতায় জ্ঞাতিত্ব, ভাতৃত্ব ও জাতিসত্তার সংহতির বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রকে অভিহিত করা হয়েছে – নীচতা ও বর্বরতা বলে।
- ১৩. রাম রাবণের যুদ্ধে স্বপক্ষ ত্যাগকারী – বিভীষণ।
- ১৪. ‘গঞ্জি’ শব্দের অর্থ – তিরষ্কার করি।
- ১৫. ‘নন্দন কানন’ শব্দের অর্থ – স্বর্গের উদ্যান।
- ১৬. ‘মজাইলা’ শব্দের অর্থ – বিপদগ্রস্ত করলে।
- ১৭. ‘বসুধা’ শব্দের অর্থ – পৃথিবী।
- ১৮. ‘তেঁই’ শব্দের অর্থ – তজ্জন্য/সেহেতু।
- ১৯. ‘মন্দ্র’ শব্দের অর্থ – শব্দ/ধ্বনি।
- ২০. ‘জীমৃতেন্দ্র’ শব্দের অর্থ – মেঘের ডাক বা আওয়াজ।
- ২১. ‘বলী’ শব্দের অর্থ – বলবান/ বীর।
- ২২. ‘জলাঞ্জলি’ শব্দের অর্থ – সম্পূর্ণ পরিত্যাগ।
- ২৩. ‘নীচ’ শব্দের অর্থ – হীন/নিকৃষ্ট/ ইতর।
- ২৪. ‘দুর্মতি’ শব্দের অর্থ – হীন/নিকৃষ্ট/ ইতর।
- ২৫. ‘পশিল’ শব্দের অর্থ – প্রবেশ করল।
- ২৬. শাস্ত্রমতে গুণহীন হলেও শ্রেয় – নির্গুণ স্বজন।
- ২৭. রথ চালনার মাধ্যমে যুদ্ধ করে যে তাকে বলে – রথী।
- ২৮. লঙ্কাপুরীতে মেঘনাদের যজ্ঞস্থানের নাম – নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার।
- ২৯. তাত শব্দের আক্ষরিক অর্থ – পিতা।
- ৩০. কবিতায় ‘তাত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে- পিতৃব্য / চাচা অর্থে।
- ৩১. অরি বা শত্র“কে যে দমন করে তাকে বলা হয় – অরিন্দম।
- ৩২. মেঘনাদ লঙ্কাকে তুলনা করেছে – প্রফুল কমলের সাথে।
- ৩৩. মেঘনাদ লঙ্কায় ল²ণের প্রবেশকে তুলনা করেছে- প্রফুল কমলে কীটবাসের সাথে।
- ৩৪. ‘নহি দোষী আমি, বৎস ; বৃথা ভর্ৎস মোরে’- মেঘনাদের কথার প্রেক্ষিতে বিভীষণ একথাটি বলেছে – মলিনবদনে।
- ৩৫. ‘পরদোষে কে চাহে মজিতে?’- এখানে ‘পরদোষে’ দ্বারা বিভীষণ বুঝিয়েছে – রাবণের দোষের কথা।
- ৩৬. লঙ্কাপুরী পরিপূর্ণ – পাপ দ্বারা।
- ৩৭. বিভীষণের নিজ পক্ষ ত্যাগ করে রামের পক্ষ অবলম্বন করাকে মেঘনাদ আখ্যায়িত করেছে – বর্বরতা বলে।
- ৩৮. ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কবিতাটিতে যতি চিহ্নের ব্যবহার হয়েছে-স্বাধীনভাবে/ বক্তব্যের অর্থের অনুষঙ্গে।
- ৩৯. ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কবিতাটি ছন্দের বিশেষ লক্ষণ – ভাব প্রকাশের প্রবহমানতা।
- ৪০. পিতৃব্যের ষড়যন্ত্রকে মেঘনাদ আখ্যায়িত করেছে – নীচতা ও বর্বরতা হিসেবে।